এশিয়ায় প্রতিযোগী অর্থনীতির দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ সবচেয়ে কম

এশিয়ার অনেক দেশ আকর্ষণ করতে পারলেও বাংলাদেশ কেন কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারছে না জানতে চাইলে চাইনিজ এন্টারপ্রাইজ অ্যাসোসিয়েশন ইন বাংলাদেশের (সিইএবি) প্রধান উপদেষ্টা কে চেংলিং বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‍বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ এখনো ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার মতো অতটা ভালো নয়, এটাই মূল কারণ।’

নিজস্ব উৎপাদন কাঠামো চীনের সীমানার বাইরে বিস্তারের কৌশল ‘চায়না প্লাস ওয়ান’ নামে পরিচিত। চীনের এ কৌশলকে আপন করে নিয়ে দেশটির বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়া। এক্ষেত্রে চীনা বিনিয়োগের আরেক সম্ভাবনাময় গন্তব্য বাংলাদেশে বিনিয়োগ তুলনামূলক অনেক কম।

সরকারি ভাষ্যমতে, ভূরাজনৈতিক বিচারে বাংলাদেশের অন্যতম মিত্র দেশ চীন। কিন্তু মোটা দাগে বিনিয়োগের সুষ্ঠু পরিবেশের অভাবেই বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ আসছে না বলে জানিয়েছেন চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি ও চীন বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের (এফডিআই) পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে চীনা এফডিআই স্টক বা পুঞ্জীভূত প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১৪১ কোটি ৩৯ লাখ ৬০ হাজার বা ১ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলারের বেশি। সরকারি সূত্রের বরাতে ভিয়েতনামের গণমাধ্যমে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী দেশটির এফডিআই স্টকের পরিমাণ অন্তত ৩০ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি। জার্মানিভিত্তিক অনলাইন পরিসংখ্যান প্লাটফর্ম স্ট্যাটিস্টার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সাল পর্যন্ত থাইল্যান্ডের এফডিআই স্টকের পরিমাণ ১২ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ডলার।

মিয়ানমারের সরকারি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত অনুমোদিত চীনা এফডিআইয়ের আকার অন্তত ২২ বিলিয়ন। যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সাল পর্যন্ত কম্বোডিয়ায় চীনের এফডিআই স্টকের পরিমাণ ১৯ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি। গণমাধ্যমের প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়ায় চীনের এফডিআই স্টকের পরিমাণ ২৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

এশিয়ার অনেক দেশ আকর্ষণ করতে পারলেও বাংলাদেশ কেন কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারছে না জানতে চাইলে চাইনিজ এন্টারপ্রাইজ অ্যাসোসিয়েশন ইন বাংলাদেশের (সিইএবি) প্রধান উপদেষ্টা কে চেংলিং বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‍বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ এখনো ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার মতো অতটা ভালো নয়, এটাই মূল কারণ।’

বাংলাদেশে বিনিয়োগ আছে এমন চীনা প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেশকিছু কারণ উল্লেখ করেছেন বণিক বার্তার কাছে। তারা বলছেন, যে দেশগুলো চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণে সফলতা দেখিয়েছে, সেসব দেশে বিনিয়োগ শুরুর প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত। এমনকি চীনে স্থাপিত অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় বিনিয়োগসংশ্লিষ্ট দরকারি সব অনুমোদন পাওয়া যায় সাত কর্মদিবসের মধ্যে। বাংলাদেশে একটা কারখানা তৈরি করে উৎপাদনে যেতে প্রায় দুই বছর সময় লেগে যায়। কিন্তু এ দুই বছর সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তার ব্যবসা থেমে থাকবে না। তার চিন্তা থাকে কত দ্রুত চীন থেকে কারখানা সরিয়ে বাংলাদেশে স্থাপন করে উৎপাদন শুরু করা যায়।

দ্রুত পরিবর্তনশীল নীতিকাঠামোও চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণে ব্যর্থতার বড় কারণ হিসেবে মনে করছেন চীনা ব্যবসায়ীরা। তারা বলেছেন, যেসব সহায়তার ঘোষণা দিয়ে বিনিয়োগ আকর্ষণ করা হয়, সেগুলো দ্রুতই বদলে যায়। দেখা গেছে যে সুবিধা পাঁচ বছরের জন্য ঘোষণা করা হয়েছে, বিনিয়োগ প্রকল্প চালু হতে হতে সেই ঘোষণা পরিবর্তন হয়ে গেছে। শিল্প স্থাপনের পর বাংলাদেশে প্রচলিত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অসহযোগিতার মুখোমুখি হতে হয় বিনিয়োগকারীকে। বিশেষ করে বন্দর ও শুল্ক কর্তৃপক্ষসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কর্তৃপক্ষের ভূমিকা ব্যবসা সহায়ক না।

বাংলাদেশে চীনা এক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এদেশে চীনা বিনিয়োগকারীদের ভাষাগত দূরত্ব রয়েছে। যে কারণে আইনকানুন সম্পর্কে ধারণাগত ভুল থেকে যায়। চীনা বিনিয়োগকারীরা নিজ দায়িত্বে সবকিছু জেনে-বুঝে নেবেন, এ ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছেন না বাংলাদেশের সংশ্লিষ্টরা। দেখা যায় অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য অনেক বড় শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়েছে চীনা বিনিয়োগকারীদের। এছাড়া বাংলাদেশে দুর্নীতি প্রবণতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয় রয়েছে, যা চীনা বিনিয়োগকারীদের কাছে নেতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে ধরা দেয়। নিজ দেশে চীনা বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তা নিয়ে একেবারেই মাথা ঘামাতে হয় না। এক্ষেত্রে বাংলাদেশে অনেকটা উদ্বিগ্নই থাকতে হয় তাদের। বাংলাদেশের ব্যাংকিং ফ্যাসিলিটিও বিদেশী বিনিয়োগের জন্য সহায়ক না। বাস্তবে বিদেশীদের ব্যাপারে ব্যাংকিং ফ্যাসিলিটিজ বৈষম্যমূলক। বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চীনাদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়াও অনেক জটিল।

গত বছর গণ-অভ্যুত্থানে সরকার পতনের আগে থেকেই বিদ্যমান চীনা বিনিয়োগ বেশ কঠিন সময় পার করছিল বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর নতুন করে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের বিষয়ে বেশ তোড়জোড় শুরু হলেও হতাশা রয়েছে চীনা বিনিয়োগকারীদের। জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিগত সরকারের সময়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির বিশেষ আইনের আওতায় ৩১টি নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের প্রকল্প বাতিল করা হয়। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মোট ৩১টি প্রকল্পের বেশির ভাগই চীনা কোম্পানির। সব মিলিয়ে এসব প্রকল্পে ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের কথা ছিল।

বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল আল মামুন মৃধা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো যতটা আগ্রাসীভাবে অর্থনৈতিক অঞ্চলের ফ্যাসিলিটিজগুলো চীনাদের সামনে তুলে ধরেছে, বাংলাদেশ সেভাবে পারেনি। চীনারা নিজেদের গরজে খোঁজখবর নিয়ে এলে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তাদের সাহায্য করা হয়, কিন্তু এ অ্যাপ্রোচে বিনিয়োগ আকর্ষণ করা যায় না।’

বিশ্লেষকরাও বলছেন, বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনার উচ্চ খরচ; অপর্যাপ্ত ও অকার্যকর অবকাঠামোর কথা। সেই সঙ্গে জটিল কাস্টমস প্রক্রিয়াসহ সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অস্থিতিশীলতার কারণে চীনসহ অন্যান্য গন্তব্য থেকে বিদেশী বিনিয়োগ আসছে না।

রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‍্যাপিড) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শুধু চীন না, অন্যান্য উৎস থেকেও বিনিয়োগ আকর্ষণে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। যদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল এবং সুদৃঢ় না হয়, তাহলে বিদেশী বিনিয়োগ আসবে না। কারণ বিনিয়োগকারীরা একটি পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ এবং এ নিশ্চয়তা চান যে তারা তাদের লাভ নিজ দেশে বা অন্য কোথাও নিয়ে যেতে পারবেন। এছাড়া বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আমাদের অতীত রেকর্ড খুব একটা ভালো নয়। এর বাইরে আমাদের একটি বড় সমস্যা হলো দক্ষ শ্রমিক এবং ব্যবস্থাপকের (ম্যানেজার) সংকট।’

গত ৭ থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিনিয়োগ সম্মেলন ২০২৫। এ সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন চীনা বিনিয়োগকারীরা। আয়োজকদের দাবি অচিরেই বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বাড়বে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য সচিবকে দেয়া এক চিঠিতে আগামী মাসে চীনের বাণিজ্য সচিবসহ ২০০ জনের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে আসবে।’

বিদেশী এক রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বাংলাদেশের একজন শিল্পোদ্যোক্তা অতি সম্প্রতি একটি বৈঠকে বসেছিলেন। সেখানে বাংলাদেশের শিল্পোদ্যোক্তা জানতে চান, শেষ হওয়া বিনিয়োগ সম্মেলনে আপনার দেশ থেকে অনেক বিনিয়োগকারী অংশ নিয়েছিলেন, বিনিয়োগ বাস্তবায়নে তারা কত সময় নিতে পারেন। জবাবে সেই রাষ্ট্রদূত প্রথমেই বলেন, ‘রাজনৈতিক সরকার ছাড়া কোনো বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে আসবে না।’ বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির যথেষ্ট উন্নয়ন হয়নি জানিয়ে সেই রাষ্ট্রদূত বলেছেন এখনো মব হচ্ছে।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চীনসহ অন্যান্য দেশের বিনিয়োগকারীরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য রাজনৈতিক সরকারের অপেক্ষায় রয়েছেন। এছাড়া বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য কী ধরনের প্রস্তাব দেয়া হচ্ছে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের স্থানীয় বিনিয়োগকারীরাই বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না, এ পরিস্থিতিতে চীনারা বা বিদেশীরা কীভাবে বিনিয়োগ করবেন?’

এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ কম কেন জানতে চাইলে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বণিক বার্তাকে বলেন, বাংলাদেশে একটি ব্যবসা শুরু করা অন্যান্য বাজারের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন।

গ্যাসের দাম বৃদ্ধিকে একটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এই সিদ্ধান্তটি নতুন ব্যবসার জন্য বৈষম্যমূলক এবং নিখুঁত প্রতিযোগিতামূলক বাজারের পথে বাঁধা হিসেবে কাজ করবে। পাশাপাশি, এফডিআই আকর্ষণের সুযোগও কমে আসবে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক সময়ে এসেছে। কারণ আমরা সদ্য একটি সফল সম্মেলন সম্পন্ন করেছি এবং সম্ভবত বিদেশে বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজছে এমন চীনা ব্যবসার একটি স্রোত দেখা যেতে পারে।‘

আরও